রহস্যপ্রেমী মানুষদের কাছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি (Death Valley) খুবই পরিচিত এক নাম। পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এই স্থানটি একদিকে যেমন সুন্দর অন্যদিকে এটি সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান এই ধরায়।
ডেথ ভ্যালি নেভাদা দিয়ে তার সীমান্তের কাছাকাছি ক্যালিফোর্নিয়ার মোজাভ রেসটের একটি বড় অংশ। বেশিরভাগ ডেথ ভ্যালি ইনইও কাউন্টি, ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের অধিকাংশই রয়েছে।
ডেথ ভ্যালি যুক্তরাষ্ট্রে ভূগোলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ২8 ফুট (-86 মিটার) উচ্চতায় সংলগ্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন পয়েন্ট বলে বিবেচিত। এই অঞ্চলটি দেশের মধ্যে হটেস্ট এবং শুষ্কতম অঞ্চলে অবস্থিত।
দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় ২২৫ কিঃমিঃ লম্বা এবং ২৪ কিঃমিঃ চওড়া ডেথ ভ্যালী আমেরিকার পূর্ব ক্যালিফোর্নিয়া এবং নেভাডার মধ্যস্থ বর্ডারে যা লাস ভেগাস হতে দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। এই উপত্যকাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ন্যাশনাল পার্ক নামে খ্যাত।
পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্যজনক স্থান ডেথ ভ্যালি বা মৃত্যু উপত্যকার যেখানে ১৯১৩ সালের জুলাই মাসে ১৩৪ ফারেনহাইট বা ৫৬.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়েছিলো যা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির তাপমাত্রাকেও হার মানায়।
বলা হয়ে থাকে একজন মানুষ সব্বোচ ৪ ঘন্টা এই অঞ্চলে বেঁচে থাকতে পারে। পশ্চিম গোলার্ধের সব থেকে শুকনো নিম্নভূমি এটি, দেখতে মানচিত্রে অনেকটা বাটির মতো মনে হয়।
বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার। এখানে জলাশয় দেখা যায় মরীচিকার মতো, যা আছে তাও মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত।
![]() |
| Badwater Basin (লবনাক্ত পানির অববাহিকা) |
এই মৃত্যু উপত্যকার প্রায় পুরোটা ঝরঝরে ধু ধু বালিতে ঢাকা। কোথাও কোথাও এ ধূলার স্তুপ তিন তলা বাড়ির সমান উঁচু।
পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধের সব থেকে শুকনো নিম্নভূমি এটি, বিজ্ঞানীরা বলেছেন সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ২৮২ ফুট নিচে অবস্থানরত এই উপত্যকাটি।
এমন পরিবেশে খুব সামান্যই গাছ বাঁচতে পারে। এখানকার বেশির ভাগ গাছপালাই পাহাড়গুলোর নিচের অংশে এবং পাথরের গভীর খাদে জন্মায়। এ সব গাছ আবার বৃষ্টির পানিকে কাণ্ডমূলে অনেকদিন ধরে রাখতে পারে। এমনকি এরা পানির খোজে মাটির ৫০ ফুট গভীরে যেতেও বিস্তৃত হতে পারে।
![]() |
| ডেথ ভ্যালী পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান |
এত গরমের মধ্যে দিনের বেলায় কোন প্রাণীর টিকিটাও দেখা যায় না এখানে, শুধু লিজার্ড নামক এক প্রকার গিরগিটি ছাড়া। এ ভয়াবহ রকম গরম প্রায় ১২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা কোন প্রাণীর পক্ষে সহ্য করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু অবলীলায় লিজার্ডরা ঘোরাফেরা করে। অন্যান্য প্রাণীরা নিজেদের এ সময় গর্তের মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
সন্ধ্যা হওয়ার পরে ডেথ ভ্যালি অবশ্য বিশেষ কিছু প্রাণীর স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। এখানে বিভিন্ন ধরনের ছোট স্তন্যপায়ী, পাখি এবং সরীসৃপের আবাস। এর মধ্যে রয়েছে নেকড়ে, শিয়াল, ইদুর খরগোস জাতীয় প্রাণী শশক আর হাজারে হাজারে বাদুড়।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা ডেথ ভ্যালীতে ৯০০০ বছর পূর্বের মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছে। ধারণা করা হয় তৎকালীন মানুষের পছন্দের জায়গা ছিলো এই ডেথ ভ্যালী। “Timbisha Shoshone Native” নামক আমেরিকান এক উপজাতি ১০০০ বছর পূর্বে এখানে বসবাস করতো।
![]() |
| চলমান পাথর বা Sliding Stones |
Death Valley বা মৃত্যু উপত্যকায় এক আশ্চর্য ধরণের ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় আর তা হলো চলমান পাথর বা Sliding Stones. আসলেই প্রকৃতি কতো রহস্য দিয়ে গঠিত তার অন্যতম উদাহরণ ডেথ ভ্যালির এই পাথরগুলো।
একেকটা পাথরের ওজন কয়েকশো পাউন্ডের বেশি হলেও দেখা যায় তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ হতেই স্থান পরিবর্তন করে।
পাথরগুলিকে অবশ্য চলমান অবস্থায় কেউ কখনো দেখেনি, তবুও পাতলা কাদার স্তরে রেখে যাওয়া ছাপ থেকে এদের স্থান পরিবর্তন নিশ্চিত হওয়া যায়। পাথরগুলি কখনোই সরল পথে গমন করে না বরং কিছু সরল পথে চললে বাকিটুকু চলে বাঁকানো পথে। একেকটা পাথর ২-৩ বছরে একবার করে পথ পরিবর্তন করে।
হঠাৎ করে তীব্র বাতাস, কাদামাটি, বরফ, তাপমাত্রার তারতম্যতা বিভিন্ন বিষয় পাথরের সরে যাওয়ার পেছনে কারণ বলে বিজ্ঞানীরা মনে করলেও পাথরের চলার পথের ভিন্নতার কারনে তা রহস্যই থেকে যায়। ভারি ভারি এই পাথরগুলো কিভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, সে রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।
![]() |
| ডেভিলস হোল |
এই উপত্যকার আর একটি দেখার জিনিস হলো ২৫ হতে ৫০ হাজার বছর পূর্বে গঠিত লবণের কঠিন আবরণ দ্বারা আচ্ছাদিত খ্যাতনামা ‘ডেভিলস হোল’। এটি হলো ডেথ ভ্যালীতে অবস্থিত একটি গভীর খাঁদ যা সম্পূর্ণ পানি দ্বারা পরিপূর্ণ।
![]() |
| ডেভিলস হোল |
এই খাঁদটিতে পাপ-ফিস নামক এক প্রজাতির জলচর মৎস্য প্রাণীর দীর্ঘ বিশ হাজার বছর ধরে বসবাস। অনেকে বিশ্বাস করেন এই খাঁদটির পানি বৈশ্বিক ভূকম্পনের আভাস দিতে পারে। যেমন জাপান বা তার পাশাপাশি কোথাও বড় ধরণের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা থাকলে এই খাঁদটির পানিতে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়।
![]() |
| Telescope Peak |
এখানে আরো দেখার জন্য আছে বিখ্যাত Telescope Peak যা ডেথ ভ্যালী পার্কের সর্বোচ্চ চুড়া হিসেবে খ্যাত, উচ্চতা প্রায় ৩৩৬৬ মিটার।
১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্টের ঘোষণাবলে ডেথ ভ্যালী জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্থাপিত হয় এবং ১৯৯৪ সালে ডেথ ভ্যালীকে ন্যাশনাল পার্কে রূপান্তর করা হয়। বছরে প্রায় লক্ষাধিক ভ্রমণবিলাসী পর্যটকের আবির্ভাব ঘটে ডেথ ভ্যালীতে। এরমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ১০ লক্ষ পর্যটক ২০১৪ সালে ভিজিট করে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির এক অপার ভয়ানক সুন্দর সৃষ্টি এই ডেথ ভ্যালী যা সম্পর্কে আজও চলছে গবেষণা।







No comments: